উপন্যাস: অধরা
পর্ব ১০:
সমুদ্র যেন আচমকা বদলে ফেলেছে তার স্বর।
হাসিখুশি ঢেউগুলো এখন গম্ভীর।
হাওয়ার ভেতর বিষণ্ণতার নীলা রং মিশে গেছে।
দিগন্ত জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা।
আরভি দৌড়াচ্ছে।
পায়ের নিচে কক্সবাজারের নরম বালু দেবে যাচ্ছে,
তবুও সে থামে না।
তার বুকের ভেতর কেমন একটা হাহাকার বাজছে, যেন হারিয়ে ফেলা কারো নাম ডাকছে প্রতিটা শ্বাসে—
"আয়েশা…"
পেছনে ছুটছে বন্ধুরা, হাঁপাতে হাঁপাতে।
কেউ বলছে, "ও হয়তো ওদিকেই গেছে!"
কেউ চিৎকার করছে, "সমুদ্রের দিকে খুঁজো!"
কিন্তু আরভির মন বলছে অন্য কথা।
তার মন টের পাচ্ছে—
আয়েশা এখন একা, খুব ভয় পাচ্ছে।
আর সে জানে, শুধু সে-ই পারে তাকে খুঁজে পেতে।
কারণ, অনুভূতির যে লুকোনো পথ, তা বন্ধুত্বের নয়—
সেটা হৃদয়ের পথ, যেখানে একমাত্র তারই প্রবেশাধিকার।
আরভি দিগন্তের দিকে তাকিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়ায়।
আকাশের গায়ে তখন নরম কমলা আলো।
সূর্য অস্ত যেতে শুরু করেছে।
সমুদ্রের গর্জন যেন একাকীত্বের করুণ গান।
হঠাৎ দূরে, খুব দূরে,
কোনো একটা আবছা ছায়া চোখে পড়ল আরভির।
সেই ছায়াটা বসে আছে বালুর উপরে।
মাথা নিচু করে।
হাওয়ায় চুল উড়ছে এলোমেলো।
আর তার পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে ক্ষুব্ধ ঢেউয়ের ফেনা।
আরভি আর এক মুহূর্ত দেরি করল না।
সে দৌড়ে ছুটে গেল ছায়ার দিকে।
বুকের ভেতর যেন দম বন্ধ হয়ে আসছে।
কাছে আসতেই চিনে ফেলল—
আয়েশা!
ছোট্ট মেয়েটার মতো গুটিয়ে বসে আছে সে।
চোখ মুছে ফেলতে চাচ্ছে কিন্তু পারছে না।
শরীর কাঁপছে মৃদু শীতে আর ভয়ে।
তার সারা মুখে শুধু একটাই অভিব্যক্তি—
ভয় আর নির্ভরতার খোঁজ।
আরভি দম ছাড়ল গভীরভাবে।
এক হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল আয়েশার সামনে।
"আয়েশা,"
তার কণ্ঠ নরম, আশ্বাসময়।
"আমি এসেছি। তোমার কিছু হবে না।"
আয়েশা একবার মুখ তুলল।
ভেজা চোখে তাকাল আরভির দিকে।
তার চোখের কোণে আটকে থাকা অশ্রু যেন বলল—
‘তুমি যদি না আসতে... আমি হারিয়ে যেতাম...’
আরভি ধীরে ধীরে তার হাত ধরল।
"চলো, বাড়ি ফিরে যাই।"
আয়েশা কিছু বলল না।
শুধু নিঃশব্দে আরভির হাত আঁকড়ে ধরল, যেন সেই হাতটাই এখন তার পুরো পৃথিবী।
পেছনে তখন দলটাও এসে পৌঁছেছে।
বন্ধুরা চেঁচিয়ে উঠল স্বস্তির নিঃশ্বাসে,
"আয়েশাকে পেয়েছি!"
"আলহামদুলিল্লাহ!"
কিন্তু এই ভীড়ের মাঝেও
শুধু আরভি আর আয়েশার মাঝখানে
অদৃশ্য একটা বন্ধন তৈরি হয়ে গেছে।
একটা নিঃশব্দ চুক্তি—
"আমি হারিয়ে গেলে, তুমিই আমায় খুঁজে পাবে।"
আকাশ তখন একটু একটু করে আরো গাঢ় নীল হয়ে যাচ্ছে।
সমুদ্রের ঢেউ আবার হাসতে শুরু করেছে।
কিন্তু দুজন মানুষের জীবনে আজ থেকে এক অন্যরকম ঢেউ উঠতে শুরু করল।
নীরবে, গভীরে...
---
চলবে...
উপন্যাস: অধরা
পর্ব ৯:
কক্সবাজারের আকাশ তখন সোনালী রঙে রাঙা।
সমুদ্রের অসীম ঢেউ এসে আবার ফিরে যাচ্ছে।
বালুর উপরে সবাই হাঁটছে দল বেঁধে— ছেলেরা, মেয়েরা, হাসির রোল, ছোটাছুটি।
আর আয়েশা?
সে একটু সবার থেকে দূরে দাঁড়িয়ে, চোখ মুছে নিচ্ছে বাতাসে উড়ে আসা চুলের গুচ্ছ।
তার দৃষ্টি গভীর সমুদ্রের দিকে।
হঠাৎ যেন সে আর নিজের ভেতর আটকে পড়ে গেল।
চোখ বুঁজতেই সে দেখতে পেল—
আরভি তার দিকে এগিয়ে আসছে।
আকাশজোড়া নরম আলো, চারদিকে শান্তির ছায়া।
আরভি তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসছে, দু’হাতে ধরে রেখেছে আয়েশার হাত।
কথা নেই, শব্দ নেই, শুধু অনুভূতি।
আয়েশার ঠোঁট কাঁপে।
সে নিজেই বলে ওঠে মৃদু স্বরে—
"আরভি..."
স্বপ্নের মতো মুগ্ধ হয়ে সে এগিয়ে যায়।
জগৎ সংসার, মানুষ, হইচই—সব হারিয়ে যায় কানে।
শুধু মনে হয়, এই সমুদ্রের অসীম নীলতার ভেতর ওরা দুজন ছাড়া আর কেউ নেই।
কিন্তু বাস্তবতা থেকে, খুব আস্তে আস্তে সরে যাচ্ছে আয়েশা।
সে একাই হাঁটতে হাঁটতে দল থেকে অনেক দূরে চলে এসেছে।
কেউ খেয়াল করল না।
সমুদ্রের শব্দে চাপা পড়ে গেল তার পায়ের শব্দ।
হঠাৎই দূরে তাকিয়ে দেখে—
চারদিকে কেউ নেই।
শুধু বিশাল নির্জন সৈকত আর অবিরাম ঢেউয়ের গর্জন।
আয়েশার বুক ধক করে উঠল।
ভয় চেপে ধরল তাকে।
সে পেছনে ফিরতে চাইল,
কিন্তু কোন দিক থেকে এসেছিল তা যেন মনে করতে পারছে না।
হাওয়া আরও জোরে বইতে লাগল।
আকাশও যেন একটু মলিন হয়ে এলো।
"রাফি? শাকিল?..."
"আরভি?"
আয়েশা চিৎকার করে ডাকতে চাইল, কিন্তু কণ্ঠ আটকে গেল।
ভয় আর হতাশায় চোখ ভিজে উঠল।
ওদিকে, বাকিরা তখনও নিজেদের মধ্যে মজা করছিল।
হঠাৎ করেই রাফি ঘড়ি দেখে চমকে উঠল,
— “আরে, আয়েশা তো চোখে পড়ছে না!”
শাকিল বলল,
— “হয়তো পাশে আছে…”
কিন্তু না।
খুঁজতে খুঁজতে সবাই যখন টের পেল আসলেই আয়েশা নেই,
তখন ভয় ছড়িয়ে পড়ল পুরো গ্রুপে।
আরভি চারদিকে তাকিয়ে এক মুহূর্ত থমকে রইল।
তার বুকের ভেতর যেন কারা জানি বাজিয়ে দিলো একটা অদৃশ্য ঘণ্টা।
শুধু একটা অনুভূতি—
আয়েশা বিপদে আছে।
কথা না বাড়িয়ে সে দৌড়ে বেরিয়ে পড়ল সমুদ্রের দিকে।
দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করতে লাগল।
চোখে খুঁজছে একটিমাত্র মুখ,
হৃদয়ে ডেকে চলছে একটিমাত্র নাম—
"আয়েশা!"
বাতাস ভারী হয়ে আসছে।
আকাশের রঙ বদলে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।
সমুদ্রের গর্জনও যেন আজ একটু ভয়াবহ।
আরভি দম ফেলতে না ফেলে দৌড়াচ্ছে।
কিছুতেই থামবে না।
আজ কিছুতেই হারাতে দেবে না সে আয়েশাকে।
কিছুতেই না…
---
চলবে...
পর্ব ৫: অধরা উপন্যাস
ঘরের বাতাসে তখন একটা নরম গন্ধ—
ভেজা মাটির, পুরনো কাগজের, আর একরকম চুপচাপ অনুভূতির।
অধরা ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।
চোখে আজ অন্যরকম এক শান্তি, যেন বহুকালের তৃষ্ণা নিয়ে ফিরে এসেছে কোনো এক চেনা আশ্রয়ে।
আরভি কিছু না বলে ইশারায় তাকে জানালার পাশে বসতে বলল।
ওর মনে হচ্ছিল, এই মুহূর্তে শব্দগুলোই অপ্রয়োজনীয়—শুধু উপস্থিতিটাই যথেষ্ট।
অধরা চুপচাপ বসে একটা কাগজের টুকরো বের করল।
আরভির দিকে এগিয়ে দিল।
আরভি নিতে নিতে দেখল, এতে হাতে লেখা কয়েকটা লাইন:
"কিছু গান শেষ হয় না,
কিছু গল্প থেমে গিয়েও বাজে মনে।
তুমি যদি কখনো থেমে যাও,
জেনে রেখো—কেউ অপেক্ষায় ছিল চুপচাপ।"
আরভি থমকে গেল।
এটা কি অধরার নিজের লেখা?
নাকি কারো কাছে পাওয়া?
চোখ তুলে তাকাতেই অধরা বলল:
— “এইটা আমার না। আমার মায়ের লেখা। ছোটবেলায় আমাকে দিতেন... যখন কিছু হারিয়ে ফেলতাম বা কাউকে হারাতাম।”
আরভির বুকের ভেতর যেন কেমন করে উঠল।
অধরার অতীতের কোনো চাপা ক্ষত স্পষ্ট টের পেল সে।
কিন্তু অধরা এগিয়ে আরও বলল:
— “মা বলতেন, অসমাপ্ততার মধ্যেও জীবন থামে না। বরং সেখানে নতুন সুর ওঠে।
আমি... সেই সুর শুনতে শিখেছি।
আর এখন, চাই তুমি আমার সঙ্গে সেটা শুনো।”
আরভি মনে মনে খুব গভীরভাবে অনুভব করল—এই মেয়েটি কেবল তার সামনে আসেনি,
তার জীবনের এক ফাঁকা জায়গা পূরণের ইঙ্গিত নিয়ে এসেছে।
কিছুক্ষণের নীরবতার পর অধরা ব্যাগ থেকে আরেকটা জিনিস বের করল—
একটা পুরনো ক্যাসেট টেপ।
লাল কালি দিয়ে লেখা ছোট্ট একটা শব্দ তার গায়ে:
"অধরা"।
আরভি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল:
— “এটা কী?”
অধরা হেসে বলল:
— “আমার মায়ের রেকর্ড করা শেষ গান। কোনোদিন প্রকাশ পায়নি।
মা বলতেন, এই গানের জন্য সঠিক শ্রোতার দরকার...
তুমি কি শুনবে আরভি?”
আরভি নরম গলায় বলল:
— “আমি শুনব অধরা।
কারণ আমি বুঝতে শুরু করেছি—তোমার হারিয়ে যাওয়া গল্পগুলো আমার খুঁজে পাওয়া গল্পের শুরু হতে পারে।”
বাতাস তখন জানালার বাইরে শিস দিচ্ছিল।
পৃথিবীর কোথাও কোনো তাড়াহুড়ো ছিল না—
শুধু দুটো মানুষ বসে ছিল একসাথে,
একটা পুরনো ক্যাসেটের অমীমাংসিত সুর হাতে নিয়ে,
যেন ঠিক এই মুহূর্তে তারা কোনো নতুন ইতিহাস লিখতে চলেছে—
অসমাপ্ত গল্পের ভিতর জন্ম নিচ্ছে এক নতুন সুর,
একটা নতুন শুরু।
---
চলবে...